“...সিংহ শিশু হায়
ভুলি পরিচয়
মেষ দলে রহে পড়ি’। ...
আঁধার গুহায় সিংহ
ঘুমে রয়
দুরন্ত ফেরুর দল।
সিংহে মৃত ভাবি
মিশিয়াছে সবি
করিতেছে কোলাহল” ।। (গুরু
চাঁদ চরিত/ ১৩১)
(গুরু চাঁদের বাণী
অবলম্বনে ছোট গল্প)
সে ছিল প্রসব
যন্ত্রণা পীড়িত একটি সিংহী। পেটে দীর্ঘ দিন অভুক্ত থাকার মরণ খিদে। সন্তানের
সুস্থ্যতার জন্য তার কিছু একটা খাওয়া ভীষণ জরুরী। শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে
সিংহীটি শিকারের জন্য উঠে দাঁড়ায়। কিছুটা তাড়া করে ঝাঁপিয়ে পড়ে একপাল ভেড়ার পালে।
অভ্যাস মত লাফিয়ে পড়ে ভেড়াদের লক্ষ্য করে। বিফল হয় সিংহীটি। তার নখ ও থাবার আওতা থেকে ভেড়াগুলো পালাতে সক্ষম হয়। পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ে সিংহীটি। প্রসব যন্ত্রণায় ছট ফট করতে করতে মারা যায়।
অভ্যাস মত লাফিয়ে পড়ে ভেড়াদের লক্ষ্য করে। বিফল হয় সিংহীটি। তার নখ ও থাবার আওতা থেকে ভেড়াগুলো পালাতে সক্ষম হয়। পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ে সিংহীটি। প্রসব যন্ত্রণায় ছট ফট করতে করতে মারা যায়।
ভেড়ার পাল তো অবাক! কৌতুহল হয় সিংহীকে পড়ে থাকতে দেখে! সিংহীর পেটের কাছে তুলতুল করে নড়ছে কি ওটা ? কোন বাচ্চা ভেড়া
নয়ত? ভেড়া
সর্দার সকলকে নিয়ে আক্রমণ করে মৃত সিংহীকে। ঝটিতি আক্রমণে ছিনিয়ে নিয়ে আসে
বাচ্চাটিকে। কিন্তু কি কান্ড! এটাতো ভেড়ার বাচ্চা নয়! একেবারে সিংহের বাচ্চা! সিংহ এদেশের রাজা! তার বাচ্চা নিয়ে ভেড়ারা কি
করবে? একে ছেড়া যাওয়াই
নিরাপদ হবে মনে করল সবাই। পালের গোদা ভেড়ার মনে এল এক জটিল অঙ্ক। ম্যাতকারে ঘোষণা
করল সিংহের বাচ্চাটি ভেড়াদের সাথেই থাকবে। অগত্তা যাযাবর ভেড়ারা সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা বনের রাজা
সিংহের বাচ্চাকে ভেড়ার মত প্রতিপালন করবে। ভেড়া মায়ের দুধ খাইয়ে ভেড়ার আচরণ
শেখাবে। ঘাস পাতা খাওয়ানো শেখাবে। আর সিংহের আচরণ, সিংহের সংস্কৃতি,
আত্মপরিচয়
ও আত্মসম্মান একেবারেই ভুলিয়ে ছাড়বে।
সেই থেকে সিংহ সাবক ভেড়ামায়ের কাছে থাকে। ভেড়ামায়ের দুধ খায়। ম্যা
ম্যা করে ভেড়ামাকে মা বলে। ভেড়াদের সাথে ঘাস খায়। শৃগাল, কুকুর, হায়না এমনকি
শকুনেরা তাড়া করলে লেজ গুটিয়ে পালায়। গায়ে গর্তে বেড়ে উঠলেও রয়ে যায় ভেড়ার
মানসিকতা। নখ, থাবা, গুম্ফ ও কেশর বিকশিত হলেও ভেড়ার বৃত্যে ঘুরপাক খায় তার স্বপ্ন। একটি
নাদুস নুদুস ভেড়া রমণীর গায়ের গন্ধ পাওয়ার জন্য সে আকুল হয়ে ওঠে।
একদিন ভেড়ার পালে সিংহকে চরতে দেখে বিস্মিত হয় সমবয়সী একটি যুবক
সিংহ! নিঃশব্দে গুড়ি মেরে খানিকটা এগিয়ে যায়।
ঘাড় উঁচু করে দেখার চেষ্টা করে ওটা সিংহ কিনা! নিশ্চিন্ত হলে দৌড়ে
কাছে আসতে চায়। কিন্তু কী কান্ড! সিংহটাও ভেড়ার পালের সাথে ম্যা ম্যা করে পালাচ্ছে
যে?
যুবক সিংহটি একটু জোরে দৌড়ে ভেড়ার পালের সিংহের কাছে চলে আসে। গর্জন
করে বলে, "আরে তুই পালাচ্ছিস কেন? তুই তো ভেড়া নোস। আমার মতোই
সিংহ"। ভেড়ার পালের সিংহ মানতে চায় না। ম্যা ম্যা করে পালের দিকে ছুটতে থাকে।
ভীত গলায় বলতে থাকে, "আমি ভেড়া। ভেড়ামা আমার মা। ভেড়াদের খাবার আমার
খাবার। ভেড়াদের ভাষা আমার ভাষা।
যুবক সিংহটির কৌতূহল আরো বেড়ে যায়। কাছে এসে ধরে ফেলে তাকে। মাটিতে
চেপে ধরে ম্যা ম্যা ডাক বন্ধ করতে চায়। উল্টে পালটে দেখে নেয়। এটা সিংহ কিনা। দাঁত,
নখ,
চোখ,
কপাল,
গোঁফ,
কেশর
দেখে নিশ্চিত হয় এটা সিংহই বটে। কিন্তু কী কান্ড থাবা একটু আলগা হলে ও পালাতে চায়।
ম্যা ম্যা করে জানতে চায় যুবক সিংহটি তাকে মেরে ফেলবে কিনা?
যুবক সিংহটি জানিয়ে দেয় অকারণে সে প্রাণী হত্যা করে না। এ রাজ্যের
এটাই নীতি। ভীত সিংহটি বলে, "দোহাই তোমার আমাকে ছেড়া দাও। আমি ভেড়ার দলে চলে
যাই। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় যুবক সিংহটি। থাবা আলগা হয়ে আসে। আত্মবিস্মৃত সিংহটি ম্যা
ম্যা করে পালিয়ে গেলে সে আহত বোধ করে। প্রতিজ্ঞা করে আগামী কাল অপরিণত সিংহকে
ভেড়ার পাল থেকে বের করে না আনা পর্যন্ত সে শিকারে যাবে না। বেভুল সিংহের আত্মপরিচয়
ও আত্মমর্যাদা জাগ্রত করাই তার মিশন।
ভেড়ার পালকে সারা রাত ধরে অনুশরণ করে সে। দিনের আলো ফুটতে না ফুটতেই
একেবারে ভেড়ার পালের সিংহের কাছে পৌঁছে যায়। ভড়কে যায় ভেড়ার পালের সিংহটি। পালাতে
থাকে। আবার সেই একই নাটক। একই সেখানো বুলি। আবার সেই ম্যা ম্যা যুক্ত তৎসম ম্যাৎকার।
গর্জে ওঠে যুবক সিংহটি। বেভুল সিংহকে তাড়িয়ে নিয়ে আসে জলাশয়ের ধারে।
তারপর ঘাড় ধরে বলে, "এই দ্যাখ আমাদের দুটো ছায়া। এবার বিচার কর আমরা
দুজন এক বংশীয় কিনা! তোর দাঁত, নখ, থাবা, গোঁফ, কেশর আমার মত
কিনা! কর্ম ফেরে আজ তুই ভেড়াদের গোলাম।
ছায়া দেখে নিজেকে চিনে নে। ভ্যাড়ামো ছাড়। আমার মত গর্জন করে বল, আমি সিংহ। এই
দেশের ভূমি পুত্র। নিজের অস্তিত্ব ও মর্যাদার জন্য আমারও ভাগিদারি চাই"।
এমন বজ্র নির্ঘোষ,আত্মপ্রত্যয়ী
স্বজন বানী রক্তের ভিতরে কেমন আগুনের হলকা খেলে যায়! জলের ছায়া মনের গভীরে ছাপ
ফেলতে শুরু করে। থর-থর করে কাঁপতে থাকে
সমস্ত শরীর। এ কী আলো না শিহরণ! এ কী বাতাস না জ্ঞানপ্রবাহ! এ কী শব্দ না
কাঙ্ক্ষিত মুক্তির ধ্বনি! অভিভূত, আপ্লুত চোখের থেকে ঝর-ঝর করে নেমে আসে
আনন্দধারা। ধুয়ে ফেলে সমস্ত গ্লানি। নম্র আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে নিজের স্বদেশ।
তারপর নিরবতা। নিরবতা আরও প্রগাড় করে তোলে দুজনের আলিঙ্গন।
বনের সিংহটি জলদ গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, জানিনা তোর মত
আরো কত সিংহসাবক আর কোন কোন ফেরুর পালে চরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তোকে কথা দিলাম কাল
থেকে ভেড়া, ছাগল, কুকুর বা শিয়ালেরপাল থেকে সিংহ শাবকদের বের করে আনবো। এটাই আমার
ব্রত। এটাই আমার একমাত্র পথ। তুই আমার সাথে থাকবি তো?
বলিষ্ঠ ঘাড় নাড়ে সিংহটি। কেশর দুলে ওঠে স্বাভাবিক ছন্দে। সোনালী রোদ,
নদীর কলতান আর পাখির কুজনে এক চিরন্তন গীতে মুখরিত হয়ে ওঠে সমস্ত বনভূমি।
No comments:
Post a Comment